মার্চের কবিতা

দেবব্রত ঘোষ মলয়ের তিনটি কবিতা 


বন্ধ জানালা


বন্ধ জানালা একবার খুলে দাও 

খুলে দাও দরজাও ... বেরিয়ে যাক বদ্ধ বাতাস

ড্রয়িং রুমে সাজানো ম্রিয়মাণ মানিপ্লান্ট আর

দামি অ্যাকোয়ারিয়াম এর রঙিন মাছগুলো

দেখো সূর্যালোকে, নবীন বাতাসে কেমন হেসে ওঠে


এবার ধীরে ধীরে সব সংকোচ ভেঙে 

বেরিয়ে এসো ঘরের বাইরে খোলা রাস্তায় 

বহুদিন না দেখা প্রতিবেশীকে ডেকে বল কেমন আছো

ছোট শিশুটির গাল টিপে দাও, তুলে নাও কোলে

দেখো আত্মীয় হয়ে যাবে সব প্রতিবেশী। 


তুমি জেনে যাবে পাশের বাড়ির নমিতা বৌদি, 

বিধবা হয়ে গেছে ... ঘোষাল কাকার চাকরি নেই দুমাস 

রিমঝিম আর পালক এর ধুমধাম বিয়ে টেকেনি

সান্যাল বাড়ি জমি ভাগ নিয়ে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে 

এখন চারটে হাঁড়ি ... অভিশাপ মেখে ভাত খায় রোজ


খালপাড়ের নিধু ঘোষাল, মৃত্যুর আগে শেষ তিন মাস 

বড় কষ্ট পেল, গর্বের পরিবারের কেউ ছিলনা পাশে

অথচ নিয়ম ভঙ্গের দিন সে কি ধুমধাম কত লোকজন 

তোপসে মাছ, দই কাতলা, এঁচোড় চিংড়ি, ইলিশ ভাপা

ঘরের দরজা বন্ধ করে তুমি কিছু জানতেই পারোনি 


দরজা বন্ধ করো না, বন্দী কোরো না নিজেকে 

পাহাড় প্রমাণ ইগো, তুচ্ছ অভিমান, মিথ্যে অহংকার 

বড় ছোট করে দেয় বড় নিঝুম করে দেয়

একবার মানুষের কাছে এসো মাটির কাছে এসো 

দেখো কত ভালোবাসা দুহাত বাড়িয়ে চারপাশে 


পুরনো সূর্য রোজ নতুন হয়ে আসে আকাশে ...


৩১ মার্চ ২০২৫


অন্তিম ইঙ্গিত


চারা গাছে জল দিতাম নিয়মিত

নতুন পাতা ফুলের কুঁড়ি এবং প্রস্ফুটিত 

সবকিছু নিয়েই উপচে পড়েছিল বাগান 

বৃষ্টি হলে, সবার সাথে সেও করত ধারাস্নান 

মাটির দিকে তাকাইনি কখনো 

ধীরে ধীরে সরে গিয়েছিল মাটি

নতুন পাতার আগায় আমার দেওয়া জল 

গোড়ার শূন্যতায় হয়ে যেত নিষ্ফল

অন্তিম ইঙ্গিত বুঝতে পারিনি, এ আমার ব্যর্থতা

সব সম্পর্ককেই রোদ জল মাটি দিতে হয়

এখন আমার হাহাকার কান্নাও নিষ্ফলা  

নিরন্তর অনাদরে শুকিয়ে যায় সুফলাও ...


২৭ মার্চ ২০২৫


কবিতা দিন


বাবা গীতা পড়তেন নিখুঁত উচ্চারণের সংস্কৃতে 

আমি তখন কফি হাউসে অপেক্ষা করতাম গীতার জন্য 

কফি হাউসে অনেক দাড়ি-পাঞ্জাবী-ঝোলা কবিরা আসতেন 

তখন কবিতা দিবসের কথা কেউ বলতো না। 


খুব বেশিদিন কফি হাউসের ইনফিউশন সইল না

বাবার অকাল অবসর আমাকে ডালহৌসি চেনাল

কবিতার খাতা কখন লেজারের পাতা হয়ে গেল 

সকাল ন'টার গরম ভাত রাত্রি ন'টায় চোখ জুড়ে আসে 


গীতাও কোথায় হারিয়ে গেল তার বাসন্তী শাড়িসহ 

এ গল্পে কোন নতুনত্ব নেই, নিম্ন মধ্যবিত্তের ভুবনে 

শুধু আশ্চর্য, দাউ দাউ করে জ্বলে যাবার পরেও 

ফিনিক্স পাখির মত ছাই থেকে মাথা তোলে কবিতা 


ক্রিকেটের মত জীবনেও একাধিক ইনিংস হয় 

দ্বিতীয় ইনিংসে প্রকৃতির নিয়মেই লেজার মুক্তি 

পুরনো প্রেম কবিতা ফিরে এলো মাঝরাতে

বাবার গীতা পাঠ নেই, কবিতাপাঠ তর্পণ আমার


এখন সব দিনই আগের দিনের পুনরাবৃত্তি নয়

প্রতি ভোরে নব অবতারে নবজন্ম নেয় সে 

আমি মুগ্ধ হয়ে দেখি তার মনোহর ভঙ্গিমা 

অতুলনীয় রূপে নিজেকেই অতিক্রম করে রোজ


একদিন নয় ... এভাবেই প্রতিদিন কবিতা দিন হয়ে ওঠে


২১ মার্চ ২০২৫

Comments