প্রথম শিক্ষক
আমার মা কোলাঘাটের বারবড়িশা গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। তার বিয়ে হয়েছিল খুব অল্প বয়সে, মা বলতেন ৯ বছর বয়স। আমার বাবা পড়াশোনা করা মানুষ হলেও আমার মা কিন্তু খুবই কম পড়াশোনা করেছিলেন। ওই বালিকা বয়সে বিয়ে হয়ে একটি সাধারন শ্বশুরবাড়িতে চলে আসার পর সেই আমলে পড়াশোনার অবকাশ খুব একটা ছিল না। কিন্তু আমার মায়ের বাস্তব বুদ্ধি এবং বিচার আমাকে সারা জীবনে চলার পথে অনেক শিক্ষা দিয়েছে।
আমার বাবা মারা গিয়েছিলেন ২০০০ সালে। সে সময় আমার বাবা আমাদের জন্য রেখে গিয়েছিলেন প্রায় ন কাটা অগোছালো বাগানসহ পৈত্রিক জমি এবং একটি ছোট কাঁচা বাড়ি। আমরা তিন ভাই এবং আমাদের থেকে বেশ খানিকটা বড় আমাদের দিদিভাই। বাবা মারা যাওয়ার পর আমাদের ঘরবাড়ি করার প্রয়োজন পড়ে। আমার দাদার এবং আমার বিয়ে হয়ে গিয়েছিল বেশ ক বছর আগে, আমার বাবা দুই নাতির মুখ দেখতে পেরেছিলেন। আমার ভাই তখনো অবিবাহিত।
এক বছর বাদে যখন আমরা বাবার অভাব কিছুটা মানিয়ে নিয়েছি, তখন আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম বাড়ি তৈরি করার। আমার দিদিভাই এ ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিলেন। আমরা পরিকল্পনা করেছিলাম একটি তিন তলা বাড়ি বানাবার যার সামনে খানিকটা বাগান তারপর রাস্তা। সেই অনুযায়ী আমরা নকশা প্রস্তুত করার জন্য একজন পেশাদার মানুষকে নিয়ে এসেছিলাম। আমার মা কিন্তু আপত্তি করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, দেখ আমি জীবনে অনেক দেখেছি। তোদের তিন ভাইয়ের মধ্যে খুবই মধুর সম্পর্ক। কিন্তু আমি চাইনা তোরা একটা বাড়ি কর। যেহেতু জমি অনেকটাই তাই তোরা জমিটাকে তিনজনের নামে তিনটে আলাদা আলাদা প্লটে রেজিস্ট্রেশন করে তিনটে বাড়ি বানা। তাতে প্রত্যেকের নিজস্ব রান্নাঘর বাথরুম ড্রয়িং রুম থাকবে, আবার কে কোন দিকের ঘর নেবে কে কোন তলা নেবে এই সমস্যাগুলো হবে না।
আমরা মায়ের কথা হেসে উড়িয়ে দিয়ে বলি আমাদের মধ্যে তো আর ও সব হবে না। আমরা তিন ভাই তোমাকে আর দিদি ভাইকে নিয়ে আনন্দেই থাকবো। এরপর দুই নাম্বার হাওড়া কোর্টে যাই জমি রেজিস্ট্রেশন করতে। সঙ্গে মা এবং দিদি। রেজিস্টার সাহেব ছিলেন বর্ষীয়ান মানুষ। তিনি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে আমাদের কাগজপত্র খুটিয়ে দেখলেন। তারপর বললেন - দেখো বাবারা, তোমাদের একটা কথা বলি। আমি আমার জীবনে বহু বাড়িঘর রেজিস্ট্রেশন করেছি। এবং বহু অশান্তির সাক্ষী থেকেছি। শহরের মধ্যে তোমাদের অনেকটাই জমি আছে। আমার পরামর্শ হলো, তোমরা এভাবে একটা বাড়ি না করে তিনটে প্লটে জমিটা ভাগ করে তিনটা আলাদা আলাদা বাড়ি তৈরি কর। আমি তোমাদের বাবার বয়সী। আমি বলছি, তোমরা আজ বাড়ি যাও, সবাই মিলে আলোচনা কর এবং আগামীকাল এস। তোমরা যে সিদ্ধান্ত নেবে আমি আগামীকাল সেটাই করে দেব।
এরপর আমরা বাড়ি আসি এবং আলোচনায় বসে চিন্তা করি মা যা বলেছিলেন উনিও তো ঠিক তাই তাই বললেন। আমরা মত পরিবর্তন করি। আবার আমরা প্ল্যানারকে বাড়িতে ডেকে পাঠাই এবং জমিকে তিনটে ভাগে বিভক্ত করে রেজিস্ট্রেশন করার সিদ্ধান্ত নিই।
আজ আমাদের তিনটে বাড়ি। আমাদের ছেলেরা বড় হয়ে চাকরি পেয়েছে। কিন্তু কোনদিনও আমাদের বাড়িতে কোন পারিবারিক অশান্তির ঘটনা ঘটে নি। আজ শিক্ষক দিবসের দিনে আমাদের বাড়িতে পারিবারিক পুজো হলো একসঙ্গে। এই পুজোর দিনগুলোই আমরা একসাথে খাই। আমি সবসময় কর্মীর জানাই আমার প্রথাগত পড়াশোনা না করা মায়ের বিচার বুদ্ধিকে। আমাদের দেশে আমাদেরই মতো বেশ কিছু বাড়িতে পরের প্রজন্মে বাড়ি জমি ভাগাভাগি নিয়ে অনেক অনভিপ্রেত অশান্তির সাক্ষী থেকেছি। কিন্তু আমার মায়ের তীব্র বুদ্ধি এবং দূরদর্শিতার জেরে আমরা সেই দুর্যোগকে এড়িয়ে যেতে পেরেছি।
সারা জীবনের ছোট ছোট অনেক ঘটনায় মায়ের বুদ্ধিমত্তার পরিচয় পেয়েছি। ৭৮ সালের করাল বন্যায় মায়ের সহায়তায় আমরা পাড়ার ভলেন্টিয়ার দের হাতে ত্রাণের জন্য ঘরোয়া সামগ্রী তুলে দিয়েছি। সে সময় আমাদের পাড়ায় বাড়িঘরের সংখ্যা খুব কম। কিন্তু প্রায় সকলেরই জেঠিমা ছিলেন মা। আমাদের বাড়ি প্রথম টিভি আসার পরে বারান্দায় শতরঞ্চি পেতে দিতেন মা। পাড়ার সবাই একসাথে বসে টিভি দেখা হতো আর মায়ের হাতে জল খাবার চা সে আসলে ছিল নিরবিচ্ছিন্ন সঙ্গী। অবশ্যই মায়ের সঙ্গে ছিল পাশাপাশি বাড়ি বেশ কয়েকজন দিদি।
প্রকৃত শিক্ষক তো তিনি যিনি জীবনের চলার পথে বাধা সরিয়ে এগিয়ে চলার শিক্ষা দেন। যখন চাকরিতে একটা টালমাটাল অবস্থায় পড়েছিলাম মা প্রতিদিন এসে খোঁজ নিতেন। যেদিন চাকরি চলে গিয়েছিল সেদিন মা বলেছিলেন, একদম ভয় পাবি না, ঠিক কিছু না কিছু হয়ে যাবে ভগবান আমাদের সহায়। তারপর আবার কিছুদিন চাকরি করেছিলাম অন্য চাকরি। তারও পরে, প্রতিষ্ঠিত হয় ইলশেগুঁড়ি। প্রথম সংখ্যা প্রকাশের দিন মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করেছিলেন একদিন তোর এই প্রয়াস অনেক বড় হবে অনেক বন্ধু পাবি। আজ যখন আমাদের এই সাহিত্য পরিবার বৃহত্তর পরিবার হয়ে উঠেছে, বহু আপনজন প্রতিনিয়ত সঙ্গে আছেন, তখন মনে মনে আপনি প্রণাম করে মাকে বলি - তুমি এবং বাবাই আমার জীবনে প্রথম শিক্ষক।
Comments
Post a Comment