দাবদাহ
দাবদাহ
দেবব্রত ঘোষ মলয়
"আমি খুব ছোট্ট এবং সামান্য একজন লেখক। বাংলা সাহিত্য আমাকে মনে রাখবে না জানি। তাই যে কটা দিন আছি, আমি মানুষকে কষ্ট দিতে চাই না।" - স্মরণজিৎ চক্রবর্তী।
এবার গ্রীষ্মটা একটু বাড়াবাড়ি রকমের। এরকম যে আগে কোনদিন দেখিনি তা নয়। কিন্তু এবার মূল তফাৎ যেটা সেটা হল একটানা তীব্র গরম চলছে অথচ বৃষ্টি বা কালবৈশাখী হচ্ছে না দিনের পর দিন। ফলে বাইরের তীব্র দাবদাহ ক্রমশ উত্তর ভারতীয় লু এর আকার নিয়েছে। অনেক বছর আগে আমি জামশেদপুর-রাঁচিতে গিয়ে এই আবহাওয়া দেখেছিলাম।
এখন স্বাভাবিক কারণে বাইরের অনুষ্ঠানগুলো আমরা সবাই কমিয়ে দিয়েছি। বহু জন নানাভাবে তাদের উষ্মা ব্যক্ত করছেন ফেসবুকে।
কিছু বন্ধু যাদের এসি নেই তারা দোষারোপ করছেনা এসিকে, আর বলছেন প্রকৃতিকে বাঁচাতেই হবে, আর মনে মনে ঠিক করছেন পরের বছর একটা এসি কিনতেই হবে।
আমাদের লেখক প্রকাশক জগতে দুর্মূল্যের জন্য যারা মুদ্রিত বই ছাপাতে পারছেন না তারা এই গরমের পিছনে কাগজ তৈরীর নেপথ্যে প্রবল গাছ কাটাকে দায়ী করছেন আর মনে মনে ঠিক করছেন পরের বছর আরেকটু টাকা জমিয়ে মুদ্রিত বই করতেই হবে।
কেউ লিখছেন তিনি ফ্রিজ ব্যবহার করেন না বিশ্ব উষ্ণায়নকে কমানোর জন্য, প্রয়োজনে পাশের বাড়ি থেকে বরফ বা অন্যান্য সামগ্রী চেয়ে নেন।
আমাদের চিরাচরিত পাখা অর্থাৎ সিলিং বা টেবিল ফ্যান কিন্তু এসবের উর্ধ্বে। কেউ একবারও সেগুলোকে বন্ধ করার বা বয়কট করার কথা ভাবেন না কারণ ওরা অনেকটাই বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী এবং দামও কম।
কেউ কেউ চায়ের দোকানে আড্ডায় (এই গরমেও কিন্তু চায়ের দোকানে আড্ডাটা ঠিক বসছে) এটাও বলছেন প্রায় সমস্ত পুকুর বুজিয়ে ফেলে এবং সমস্ত গাছ কেটে ফেলে পরের পর ফ্ল্যাট বাড়ি তৈরীর কারণেই এই দুঃসহ গরম। তারপর বাড়ি এসে বউয়ের হাতের গরম চায়ে চুমুক দিতে দিতে বউয়ের সঙ্গে প্ল্যান করছেন পরের বছর টাকা যোগাড় করে একটা বাতানুকূল ফ্ল্যাট কিনতেই হবে।
হ্যাঁ আমরা এরকমই। আমরা নিজের বাড়ির চারপাশটা যতটা সম্ভব পরিষ্কার রাখি আর জঞ্জালের প্যাকেটটা সন্ধ্যের অন্ধকারে প্রতিবেশীর ফাঁকা জায়গায় ছুঁড়ে ফেলে দিই। সমর্থ্য থাকলে আমরা সবাই পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ব্যবহার না করে নিজের বাহন ব্যবহার করতেই স্বচ্ছন্দ্যবোধ করি। কিন্তু রাস্তায় ঘাটে চায়ের দোকানে আমরা এসবের বিরুদ্ধে বিপ্লব করি। আজকাল অতটাও যেতে হয় না ফেসবুকে বসে বিপ্লব করা খুব সহজ।
ঘটনাচক্রে আমাদের বাড়িতে এখনো একচিলতে বাগান আছে। সেখানে একটি বড় নিম গাছ, আম গাছ, পেয়ারা গাছ, চাঁপা ফুলের গাছ, পেঁপে গাছ এবং আরো দু-তিনটি নাম না জানা গাছ আছে। আছে বেশ কিছু ফুলের গাছ। তীব্র দুপুরেও খাওয়া দাওয়ার পর ওই বাগানে গেলে গরমটাকে অসহনীয় মনে হয় না, বরং মনে হয় প্রকৃতির কত রূপ। প্রচুর ফুল ফুটছে এবার।
বিকেলের দিকে ছাদে উঠি। কালবৈশাখী একেবারেই হচ্ছে না এবার কিন্তু মৃদু হাওয়া গাছের ডালগুলোকে দুলিয়ে দেয় তখন। ছাদের পাঁচিলের উপর একটা সাদা বাটিতে কিছুটা জল রেখে আসি রোজ সকালে। বিকেলে গিয়ে দেখি সে বাটি খালি। মাঝে মাঝে দু'একটি পাখিকে জল খেতেও দেখি। বন্ধুরা তোমরাও যদি এটা করো তাহলে এই গ্রীষ্মে পাখিগুলো কিছুটা নিস্তার পায়।
আসলে আমরা প্রকৃতির বিরুদ্ধে কাজ করেছি। প্রকৃতি কিন্তু তার নিজের কাজই করছে। এগুলোকে সঙ্গে নিয়েই পথ চলতে হবে। বাইরের অনুষ্ঠান কমিয়ে দিয়ে প্রচুর বই পড়ে ফেলছি। গতকাল আজ দু'দিনে শেষ করে ফেললাম স্মরণজিৎ চক্রবর্তীর নতুন একটি উপন্যাস "নীল রোলার লাল রোলার"। বইটি পড়ার জন্য অনুপ্রাণিত করেছিল আমার আত্মজ এবং তার বন্ধু। পরবর্তী প্রজন্মকে অনেকটাই পড়ে ফেলা যায় স্মরণজিৎ এর লেখায় এটা আমি প্রথম থেকেই দেখে আসছি।
এর সঙ্গে ছোট্ট ছোট্ট করে কিছু নতুন লেখাও তৈরি করে ফেলছি। তবে সবাইকে এখনই তা পড়াতে পারছি না কারণ সেই লেখাগুলি বিভিন্ন পত্রিকার শারদীয়া সংখ্যায় প্রকাশিত হবে।
আজ এতটাই থাক।
Comments
Post a Comment