মেলার ডাইরি - বর্ধমান শহর (প্রথম পর্ব)


সাঁতরাগাছি স্টেশন পৌছালাম ঠিক দেড়টায়। বই এবং জামাকাপড় একটা ব্যাগে নেওয়ায় ব্যাগটা কিঞ্চিত ভারি। ছেলের বাইকই অগতা ভরসা। রাজকুমারও দেখলাম ঠিক সময়েই এসে উপস্থিত। ট্রেনে নয় আমরা এবার যাবো বাসে। গন্তব্য বর্ধমান টাউন হল।
খুলেই বলি পরিপ্রেক্ষিতটা। আসলে প্রতিবছরের মধ্যে এ বছরও আমরা যাচ্ছি বর্ধমান লিটল ম্যাগাজিন মেলায়। প্রতিবছরের সঙ্গে এ বছরের তফাৎ একটাই, এই বছর রাত্রিবাস আজাপুরে শ্বশুরআলয়ের বদলে মেলা কমিটির আয়োজিত গেস্ট হাউসে। দূরপাল্লার বাস পরিচিত পথ দূর্গাপুর এক্সপ্রেস ধরে এগিয়ে চলল মসৃণ গতিতে। সাড়ে চারটে নাগাদ আমরা পৌঁছে গেলাম টাউন হলে মেলা প্রাঙ্গণে।
মেলার সুসজ্জিত তোরণ পেরিয়ে ভিতরে ঢুকতেই মুক্ত মঞ্চ থেকে ভেসে এলো প্রারম্ভিক অনুষ্ঠানের আওয়াজ। মেলা কমিটির সম্পাদক সুকান্ত বাবু যথারীতি একমুখ হেসে এগিয়ে এসে আমাদের অভ্যর্থনা জানালেন। মেলার অফিসে লটারির কৌটা থেকে টিকিট তুললাম। মঞ্চের ডান দিকে ইলশেগুঁড়ি স্টল আর মঞ্চের বাঁদিকে পড়ল আমাদের পদক্ষেপ। 
প্রথমেই যথারীতি টেবিল সাজিয়ে আমরা বসে পড়লাম নিজের নিজের টেবিলে। এরপর বিভিন্ন টেবিল থেকে পরিচিত মুখরা এগিয়ে এসে অভ্যর্থনা জানিয়ে আড্ডায় মেতে গেল। 
প্রথম দিন ভিড় অনেকটাই কম। তবুও কয়েকজন এলেন এবং মূলত সাইকেল সংখ্যাটি সংগ্রহ করলেন।। রাজকুমারীর কাছ থেকেও মানভূম সংগ্রহ করলেন পাঠক। এরপর খানিকটা আড্ডার মেজাজেই আমরা মেলাটা ঘুরে দেখলাম। মঞ্চ তখন সুকান্তবাবু কিছু বলছেন। পাশাপাশি দেখতে পাচ্ছি প্রতাপবাবু, ইন্দ্রনীল বকশি সহ অন্যান্য আয়োজকদের।
টাউনহলের বিস্তীর্ণ প্রাঙ্গণ কংক্রিটে বাঁধানো ফলত: ধুলোর কোন জায়গা নেই।। প্রাঙ্গণের চারদিকে স্টল গুলি সাজানো মধ্যিখানটা ফাঁকা। একদম মাঝখানে কিছুটা জায়গা নিয়ে চিত্র প্রদর্শনী এবং শিল্পীদের লাইভ পেইন্টিং এর আসর। এখানেই একটা সুন্দর প্রচেষ্টা স্কুল-কলেজের তরুণ ছাত্র-ছাত্রীদের লেখায় সাজানো দেওয়াল পত্রিকা যার নাম ক্যাম্পাস থেk।

মেলা মঞ্চের ঠিক উল্টোদিকে দুষ্প্রাপ্য পত্রপত্রিকার একটি মনোজ্ঞ প্রদর্শনীর আয়োজন করেছেন এরা। এখানে গিয়ে বহু পুরনো বাংলা পত্রপত্রিকাগুলি সংরক্ষিত আছে দেখে এলাম।
দেখতে দেখতে রাত্রি সাড়ে সাতটা পেরিয়ে গেল। মঞ্চে মাঝে মাঝে কবিতা পাঠের আসর। প্রিন্ট অন ডিমান্ড এসে বাংলা লিটল ম্যাগাজিন এর ক্ষতি করছে না লাভ করছে এই বিষয়ে একটি ছোট্ট সেমিনার হয়ে গেল। আমাদের প্রিয় ধ্যানবিন্দুর অভিক সেমিনারের উপসংহার টানলেন এভাবে - বিষয়টা প্রিন্ট অন ডিমান্ড নয়, বিষয়টা কেন বাংলা বই বা লিটল ম্যাগাজিন কে আজ পাঁচশোর বদলে ৫০ আজ ৫০০ বদলে ৫০ ছাপতে হচ্ছে। কেনই বা তরুন প্রজন্মকে দেখতে পাচ্ছি না মেলা প্রাঙ্গণে।
এর মধ্যেই হঠাৎ মেলায় উপস্থিত শুভেন্দু মাইতি। অসুস্থ শরীরেও তার জাদু মাখা কন্ঠে উপহার দিলেন একটি গান। এরপর স্থানীয় একটি মেয়ে খুব মিষ্টি কন্ঠে দু একটি বাংলা আধুনিক গান গেয়ে আজকের মত মেলার সমাপ্তি ঘোষণা করল।
এরপর আমাদের গন্তব্য গেস্ট হাউস। যথারীতি প্রায় ৮-১০ জন পত্রিকার সম্পাদক যার মধ্যে তরুণদের সংখ্যাই ভারী তারা সবাই জড়ো হলাম এক জায়গায়। এবং সবাই মিলে হাঁটতে হাটতেই মাঝরাতের বর্ধমান শহরের রাস্তা ধরে এগিয়ে চললাম কার্জন গেট পেরিয়ে খোসবাগানের দিকে। এটি আমি আগেই এসেছি। রাজকুমারকে দেখাচ্ছিলাম এখানে দু'পাশে শুধুই ডাক্তারদের চেম্বার ডায়াগনস্টিক সেন্টার অথবা বিভিন্ন ধরনের চিকিৎসা কেন্দ্রের সমাহার । এখানে একটি নার্সিংহোমের পাশের গলিতে গেস্ট হাউসে আমাদের থাকার ব্যবস্থা।
রাত্রি প্রায় দশটা। দশটাতে গেস্ট হাউস বন্ধ হয়ে যাবে। তাই আগে আমরা আমাদের খাওয়ার জন্য নির্ধারিত হোটেলে রাধাকৃষ্ণতে চলে এলাম। আমরা সম্পাদকদের গোটা দলটা হোটেলের সবকটি টেবিল দখল করে নিলাম। হাতে গরম রুটি, সবজি আর ডিমের ওমলেট দিয়ে সারা হলো রাত্রের ডিনার। এবং গেস্ট হাউসে ঢোকার মুখে মিষ্টির দোকানটিতে বর্ধমানের গরম গরম রসগোল্লা।
আমরা যে গেস্টহাউসটিতে উঠলাম তার নাম খোসবাগান গেস্ট হাউস। প্রায় প্রত্যেকেই তিনজন পাঁচজন করে বিভিন্ন রুমগুলিতে চলে গেল। বাংলাদেশ থেকে এখনই এলেন এক ভদ্রলোক তার পত্রিকা নিয়ে তার জন্য একটি রুম বরাদ্দ হলো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখা গেল আমি আর রাজকুমার রইলাম রিসেপশনে, আমাদের রুমটা গায়েব। হোটেল কর্তৃপক্ষের টালবাহানাকে এক কথায় উড়িয়ে দিলেন মেলা সম্পাদক সুকান্তবাবু ও আমাদের আবাসনের ব্যবস্থার দায়িত্বে থাকা ইন্দ্রনীলবাবু। ওদের চটজলদি হস্তক্ষেপে আমরা একটি আলাদা রুম পেয়ে গেলাম অ্যাটাচ বাথরুম সহ। একেই বলে সব ভালো যার শেষ ভালো।
সুকান্ত বাবু ইন্দ্রনীল বাবুর এতটুকুও বিশ্রাম হয়নি সারাদিন। ওরা আমাদের প্রত্যেককে থাকার ব্যবস্থা করে তবেই বিদায় নিলেন।

এবার শুভরাত্রি জানানোর পালা। আবার আগামীকাল সকালে বর্ধমান শহরে একটু ঘোরাঘুরি করে দ্বিপ্রাহরিক আহারের পর আমরা পৌঁছে যাব আবার মেলার দ্বিতীয় দিনে। ততক্ষণের জন্য সবাইকে শুভরাত্রি।

Comments