জন্মদিনে শ্রদ্ধার্ঘ্য - সন্দীপ দত্তকে যেমন দেখেছি



সন্দীপ দত্তকে যেমন দেখেছি।

দেবব্রত ঘোষ মলয়


মুখবন্ধ

সময়টা ৮০-র দশক। তখনও কলেজে প্রবেশ করা হয়নি। স্কুল জীবন থেকেই বন্ধুদের যে ঘনিষ্ঠ বৃত্ত ছিলে তারা প্রকৃতিতে প্রায় এক। গান শুনতে ভালবাসা, পণ বিরোধী আন্দোলন, কুসংস্কার বিরোধী, হৈ চৈ করা পছন্দ এবং সর্বোপরি বইকে ভালবাসা। আমাদের মধ্যে সেই ছাত্র বয়সে একমাত্র লেখক ছিল সৃজন (প্রকৃত নাম গণেশ পাল)। ওদের বাড়িটা ছিল অন্যরকম। মাটির বাড়ি, একান্নবর্ত্তী পরিবার আর টানা দালানে লেগেই থাকত নানা অনুষ্ঠান। সেখানেই আমাদের জীবনের প্রথম সংগঠন সুকান্ত পাঠচক্র। সে সময় আবহটা ছিল বামপন্থী। আমরা সেই আসরে পড়াশুনো করতাম বিভিন্ন বাংলা লেখকের বই আর নিজের লেখা কবিতা শোনাত সৃজন সহ আরোও দু একজন। ওখানেই আমি লেখে ফেললাম প্রথম কবিতা। গনেশের দাদা কার্ত্তিকদা নানা সামাজিক কাজের পরিকল্পনা করতেন। এই মধ্যেই প্রকাশিত হল হাতে লেখা পত্রিকা ক্যকটাস আর ছাপা ফোল্ডার সৃজনী (সম্ভবতঃ)। সম্পাদনায় সৃজন। তখনই একদিন ও জানালো কলকাতায় একটি লাইব্রেরি হয়েছে শুধুমাত্র লিটল ম্যাগাজিনের জন্য।

প্রথম আলাপ

একদিন পাঠচক্রে সৃজন প্রস্তাব দিল বাকসাড়ায় একটি লিটল ম্যাগাজিন প্রদর্শনী করলে কেমন হয়? চিন্তায় পড়ে গেলাম আমরা। আমরা নিজেরাই ভাল বুঝি না লিটল ম্যাগাজিন কি, সেখানে অন্যরা কি বুঝবেন। কিন্তু যৌবনের মাতনে আমরা একঝাঁক কিশোর কিশোরী বাকসাড়া হাই স্কুলে সরস্বতী পুজোয় আয়োজন করে ফেললাম এই প্রদর্শনী। মূলতঃ সৃজনের সংগ্রহের বহু লিটল ম্যাগাজিনকে সাজিয়ে রাখা হল সেই ঘরে, আর উদ্বোধন করতে এলেন সন্দীপদা। সেদিন সন্দীপদা আমাদের লিটল ম্যাগাজিন ভালবাসার মালায় প্রথম ফুলটি গেঁথে দিয়েছিলেন ওঁর শিক্ষকসূলভ প্রাঞ্জল বক্তব্যে।

গ্রন্থাগারে যাতায়াত

এরপর সৃজন এর সঙ্গে মাঝে মাঝে যেতাম লাইব্রেরিতে। দেখতাম কি গভীর নিষ্ঠা আর ভালবাসার সাথে নিজের বসতবাড়ির একতলায় ৮০০০০ এর ওপর লিটল ম্যাগাজিন সংরক্ষণ করেছেন। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ের লিটল ম্যাগাজিন থেকে নানা গবেষণার রসদ সংগ্রহ করতে এখানেই আসতেন দেশ বিদেশের গবেষকরা। সব থেকে বড় বিষয় বহু শ্রম আর সময় দিয়ে তিনি নানা ক্রমে বিভিন্ন তাকে সাজিয়ে রাখতেন এই পত্রিকাগুলি।

তাঁকে নিয়ে সংখ্যা

এরপর ২০১৬ সালে আমরা তদানীন্তন পাঁচ বাল্যবন্ধু প্রতিষ্ঠা করি ইলশেগুঁড়ি। প্রথম সংখ্যা লাইব্রেরিতে বসে উদ্বোধন করেন সন্দীপদা। তার দু বছর পরে সৃজন প্রস্তাব দেয় লাইব্রেরির জন্য এই ত্যাগ স্বীকারকে প্রণাম জানাতে একটা সংখ্যা হোক ইলশেগুঁড়ির। প্রস্তাব শুনেই সন্দীপদা বলে উঠলেন, আমি ব্যক্তিপুজোয় বিশ্বাস করি না। তাই আমাকে নয়, সংখ্যা করতে হলে লাইব্রেরিকে নিয়েই হোক। আর প্রচ্ছদে যেন আমার ছবি না থাকে। ততক্ষণে সৃজন তার মোবাইলে বন্দী করে ফেলেছে লাইব্রেরিতে বসে সন্দীপদার ছবিটি যেটি পরে আমরা তাঁর বকুনি খেয়েও ওই প্রচছদে ব্যবহার করি। 


সংখ্যাটি প্রথম সংস্করণে ছাপা হয় ৫০০ টি যেটা আমাদের মত একটি নতুন লিটল ম্যাগাজিনের জন্য দুঃসাহসের কাজ ছিল। এক বছরের মধ্যেই সে সংখ্যা নিঃশেষিত হয়ে যায়। উল্লেখযোগ্য, সন্দীপদার হাত থেকে লাইব্রেরি থেকে ওই সংখ্যা সংগ্রহ করেন বহু মানুষ। সন্দীপদা বলতেন লিটল ম্যাগজিন কিনতে হয়, ওনার টুপিতেও লেখা থাকত এ কথা। উনি খেদ করতেন বাঙালী বিজ্ঞাপনকে সঠিক পথে ব্যবহার করতে পারে না, তাই বহু মানুষ জানতেই পারে না লিটল ম্যাগজিন সম্পর্কে। পরে অনলাইন মাধ্যমে আমরা বহু সংখ্যা ও বই মানুষের হাতে পৌঁছে দিতে পেরেছি সঠিক বিজ্ঞাপনের মাধ্যমেই, কিছু মানুষের অসূয়াজনিত বিরোধিতাকে উপেক্ষা করেই।

লাইব্রেরির সমাবর্তন


প্রতি বছর থিয়োজফিক্যাল সোসাইটিতে লাইব্রেরির সমাবর্তন হত। সৃজনের সঙ্গে সেখানে যেতাম আমি। দেখতাম কি ভাবগম্ভীর অনুষ্ঠান কিন্তু কোথাও প্রচারের ঢক্কানিনাদ নেই যা আজ শেখার বিষয়। সেই সমাবর্তনগুলিতে সন্দীপদার বক্তব্যগুলো সংরক্ষণ করে রাখার মত।




সম্মান


আমাদের প্রথম থেকেই মনে হত, প্রতিদিন লিটল ম্যাগ্জিনের কত কত মঞ্চে কত মানুষ নানা জানা অজানা কারণে সম্মান পায়, কিন্তু প্রকৃতি গুণী মানুষ সন্দীপদা সে সবের তোয়াক্কাই করেন না। কৃষ্ণপদ মেমোরিয়াল হলে আমাদের এক সাহিত্য অনুষ্ঠানে তাঁর হাতে ইলশেগুঁড়ি সম্মান তুলে দিলে তিনি নিষ্পৃহ চিত্তে গ্রহণ করেন সে সম্মান।


ইলশেগুঁড়ি সম্মান নেওয়ার সময়ে

সংহিতার পরিণয়


এর মধ্যেই এল সৃজনের মেয়ের বিয়ে। সংহিতাকে খুব ভালবাসতেন সন্দীপদা। বলেছিলেন আমি অবশ্যই আসব। খুব জমকালো আয়োজন ছিল সৃজনের। আমার ও পত্রিকার অন্য তিন বন্ধুর দায়িত্ব ছিল সন্দীপদাকে গাড়ি থেকে নিয়ে আসার। আন্দুল রোড থেকে আমরা সস্ত্রীক সন্দীপদাকে নিয়ে আসি বিয়েবাড়িতে। সেখানেই প্রথম মৃদুভাষী বৌদির (সন্দীপদার সহধর্মিনী) সঙ্গে আলাপ হয়। আমাদের সহধর্মিনীদের সঙ্গে গল্পে মেতে ওঠেন তিনি। সংহিতার বিয়েতে সব অতিথিকে সুদৃশ্য একটি জুট ব্যাগে সুন্দর টবে একটি করে গাছের চারা উপহার দেওয়া হয়। সন্দীপদা খুব প্রশংসা করেছিলেন এই উদ্যোগের। 















সংহিতার বিয়েতে সস্ত্রীক সন্দীপদা ও সৃজনের সঙ্গে আমি

সাঁতরাগাছি-বাকসাড়া লিটল ম্যাগাজিন মেলা


সৃজন প্রথম থেকেই চাইত এই অঞ্চলে হোক একটি লিটল ম্যাগাজিন মেলা। শেষ অবধি তা বাস্তবায়িত হল কিন্তু তার আগেই আচমকা এক সকালে সৃজন মাত্র ৫৫ বছর বয়সে তীব্র হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে আমাদের ছেড়ে চলে যায়। আমরা গাড়ির ব্যবস্থা করতে চাইলে সন্দীপদা তীব্র আপত্তি জানান। একদম শেষের দিকে খুব অসুস্থতার সময় ছাড়া তিনি লিটল ম্যাগাজিনের অনুষ্ঠানে বাসা ট্রেনেই যাওয়া পছন্দ করতেন, উদ্যোক্তাদের চাপে ফেলতেন না। সেদিন বাকসাড়া স্টপেজে নেমে ফোনে বলেন টোটো পাওয়া যাচ্ছে না। আমরা বাইকের ব্যবস্থা করি। আমার ছেলে আর ওর এক বন্ধুকে পাঠানো হল কিন্তু সন্দীপদা তার আগেই হেঁটে চলে এসেছেন মেলায়। বিকেল চারটেয় উদ্বোধন। উনি দুপুর আড়াইটেয় চলে এসেছেন। আমি আর আমাদের শিল্প নিদের্শক দীননাথ তাড়াতাড়ি স্নান খাওয়া সেরে মেলায় আসি এবং ওঁর সঙ্গে গল্পে মেতে উঠি। ধীরে ধীরে অন্যরাও চলে এসেছেন। আমাদের সম্পাদক অমিতাভ আশীষকে নিয়ে ষষ্ঠীপদবাবুকে আনতে গিয়েছেন। মেলার উদ্বোধনী মঞ্চে শিশুসাহিত্যিক ষষ্ঠিপদ চট্টোপাধ্যায় আর সন্দীপদাকে পেয়েছিলাম আমরা। সেদিন উদ্বোধনী বক্তব্যে সন্দীপদা আমাদের একরাশ প্রেরণা যুগিয়েছিলেন।













প্রথম সাঁতরাগাছি বাকসাড়া লিটল ম্যাগাজিন মেলায় প্রধান অতিথি সন্দীপদা। ছবিতে অন্যরা বাঁদিক থেকে মেলার সম্পাদক অমিতাভ দাস, কর্মাধ্যক্ষ দীননাথ সাহা, একদম ডানদিকে মেলা সভাপতি দেবব্রত ঘোষ মলয়।

প্রয়াণের পর


আচমকাই চলে গেলেন সন্দীপদা। সেদিন মনে হয়েছিল লিটল ম্যাগাজিনের মাথার ওপর থেকে আকাশটা সরে গেল। বহু পাঠক মনে করালেন ওঁকে নিয়ে আবার কিছু করা দরকার। এবার প্রকাশিত হল সম্পূর্ণ রঙিন সংখ্যা ‘‘লিটল ম্যাগাজিনের আপনজন’’। আজও মানুষ সংগ্রহ করছেন সংখ্যাটি। একাধিকবার ধ্যানবিন্দুতে রেখে এসেছি সংখ্যাটি। সমস্ত লিটল ম্যাগাজিন কর্মীদের জন্য তিনি রেখে গেলেন এক মহান উত্তরাধিকার যা রক্ষার দায়িত্ব আমাদের।


































বইমেলার স্টলে

কলকাতা বইমেলার লাইব্রেরির স্টল আমাদের তীর্থক্ষেত্র ছিল। প্রতি বছর যেতাম। অতিমারীর আগে শেষ বইমেলায় উনি খুব অসুস্থ। আমাকে বলেন ইলশেগুঁড়ির স্টল নিও না, লাইব্রেরির স্টলেই বসো তোমার বইপত্র নিয়ে। সেবার লাইব্রেরির স্টল সামলেছিলাম। দেখেছিলাম কি ভালবাসা মানুষের। লাইব্রেরির প্রকাশনাগুলির পাশাপাশি ইলশেগুঁড়ির বহু বই ও পত্রিকা মানুষ সংগ্রহ করেছিলেন শুধুমাত্র ওঁর জন্য।

উপসংহার

শেষের দিকে লিটল ম্যাগাজিন মেলার জোয়ার এসেছিল। সন্দীপদা খুব উপভোগ করতেন এটি। বহু মেলায় তাঁকে দেখেছি কি কষ্ট করে অসুস্থ শরীরে উপস্থিত হয়েছেন। মনে আছে কলকাতার একটি অনুষ্ঠানে তাঁর মঞ্চে সেমিনার, কিন্তু উদ্যোক্তারা অন্য অনুষ্ঠানে ব্যাস্ত। তিনি আমাকে বললেন কিছু খাওয়া দরকার, নাহলে ওষুধ খেতে পারব না। আমি অনুষ্ঠানের সম্পাদককে জানাতেই তিনি খুবই লজ্জিত হয়ে সব ছেড়ে দৌড়ে গিয়ে ওনার খাবার ব্যবস্থা করলেন। ওনার কোন ইগো ছিল না। বহু মেলা বা অনুষ্ঠানে ডাক না পেয়েও শুধুমাত্র খবর পেয়ে গিয়ে দর্শক আসনে বসতে দেখেছি ওঁকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই সেখানেই ওঁকে ঘিরে সবাই। অচিরেই মঞ্চে উঠত হত ওঁকে।




সন্দীপদার কাছ থেকে শিখেছি কিভাবে কোন কিছু প্রতিদানের আশা না করেই কাজের প্রতি অবিচল থাকতে হয়। নিষ্ঠা আর একাগ্রতা নিয়ে কি ভাবে কাজ করতে হয়। ওঁর সব থেকে বড় শিক্ষা প্রচারের তোয়াক্কা না করেই কিভাবে গড়ে তোলা যায় সৃষ্টির ইমারত। আজ ওঁর জন্মদিনে সমস্ত লিটল ম্যাগাজিন কর্মীর পক্ষ থেকে তাঁকে জানাই প্রণাম।


প্রণাম

দেবব্রত ঘোষ মলয়


সব কালো রাত এক আলো ভোরে নিশ্চিত শেষ হয়

বলেছিলে তুমি শত বাধাতেও আঁধারেই শেষ নয়।

এখানে সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ঝরাপাতা যত ছিল

তোমার ছোঁয়ায় ভালোবাসা পেয়ে জীবন কুড়িয়ে নিল।


তোয়াক্কা নেই প্রত্যাশা নেই শুধু কাজ একরোখা

ভক্ত কে হল নিন্দে কে দিল বিদ্রুপ চোখা চোখা।

তোমার দেখানো আলোক শিখাটি যদি জ্বালিয়ে রাখতে পারি

শত সন্দীপ আবার আসবে এ যে ইঙ্গিত তার-ই।


















Comments