ভালবাসার ভাষা
ছোট গল্প
শিল্পী - দীননাথ সাহা
ভালবাসার ভাষা
দেবব্রত ঘোষ মলয়
মোবাইল ওয়ালেট থেকে উবেরের ভাড়া মিটিয়ে চোখ কুঁচকে আকাশের দিকে তাকায় জিনিয়া। ল্যান্সডাউন মোড়ে যখন সে শপিং সেরে উবেরে ওঠে, তখন পরিষ্কার নীল আকাশ। এখন দেখল কোথা থেকে একটা কালো মেঘ এসে ঢেকে দিয়েছে নিউটাউনের টুকরো আকাশ। তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে সামনের অভিজাত আবাসনের বাইশ তলার ফ্ল্যাটের ভিতর প্রবেশ করে সে।
উদ্দালক বড় ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে মনোযোগ সহকারে ট্রিমার দিয়ে সেভ করছিল। ডোরবেলের আওয়াজে দরজা খুলে দিয়ে উৎফুল্লস্বরে বলে ওঠে - একি রে, আজ তো মেঘ না চাইতেই জল।
তার কথার উত্তর না দিয়ে কাঁধের ব্যাকপ্যাকটা ডিভানের উপর ছুঁড়ে ফেলে মিউজিক সিস্টেমটার সামনে গিয়ে দাঁড়ায় জিনিয়া। ভ্রু কুঁচকে মন দিয়ে শোনে গানটা। উদ্দালক একদৃষ্টে তার মুখের দিকে তাকিয়ে ভাবে, এইভাবে ভ্রু কুঁচকে তাকানোটা কি জিনিয়ারই সহজাত না সব সুন্দরীরাই এভাবে তাকায়।
আচ্ছা এই বিকেল বেলা এসব কি শুনছিস বলতো? - জিনিয়ার গলায় বিরক্তি আঁচ করে উদ্দালক। সে বলে ওঠে, রবীন্দ্রসংগীত ভালো লাগে না তোর।
এবার কোমরে হাত দিয়ে তার দিকে তাকিয়ে বলে জিনিয়া - আমার ভালো লাগে কি না লাগে that's not a question। তোকে আংকেল আন্টি একদম কনভেন্ট থেকে কলকাতার নামী মিশনারী স্কুলে পড়িয়েছেন। পড়া শেষ করে তুই যে চাকরি পেয়েছিস সেটাও মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির। প্রথমে বেঙ্গালুরু, তারপর পুনে, তারপর মুম্বাই হয়ে এখন সেটেলড স্টেটসে। তারপরেও তুই রবীন্দ্র সংগীত শুনিস, বাংলা উপন্যাস পড়িস, বাংলা মুভিও দেখিস। আমার ড্যাডকে এ কথা বলতে তিনি বিশ্বাসই করেননি, হো হো করে হেসে উড়িয়ে দিয়েছেন।
উদ্দালক তার কথা শুনে হেসে ওঠে। তারপর গম্ভীর হয়ে বলে, আসলে এসবই আমার মম-এর জন্য। তিনি শান্তিনিকেতনে পড়াশোনা করেছিলেন। মম-এর পৈতৃক বাড়িও ছিল বোলপুরে। আমার দাদু স্বর্গত নৃসিংহপ্রসাদ সিংহ ডাক্তার ছিলেন। সে সময় তাঁর নাম ডাক খুব। তিনি কাজের ফাঁকে ফাঁকে কবিতা লিখতেন। অসাধারণ সেসব কবিতা ছদ্মনামে সে সময়ের নামী কিছু পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। দাদুর মৃত্যুর পর মম সেগুলি আমাকে পড়ে শোনাতেন। তখন আমি খুবই ছোট। বাবার চাকরির বদলির সুবাদে আমরা কলকাতায় চলে আসি। বাবা বহুজাতিক সংস্থার উচ্চপদস্থ কর্মচারী ছিলেন। আদব কায়দা থেকে জীবন ধারণে পাক্কা সাহেব ছিলেন তিনি। আমাকে ছোট থেকেই কনভেন্ট স্কুলে ভর্তি করিয়ে শুধু পড়াশোনাই শেখান নি, পশ্চিমী আদব-কায়দায় রপ্ত করিয়েছিলেন। তিনি আমাকে শেলী, বায়রন, কিটস পড়াতেন নিজে। পাশাপাশি মায়ের কাছে বিভূতিভূষণ, রবীন্দ্রনাথ, সত্যজিৎ রায়, তারাশঙ্কর প্রমূখ বড় বড় সাহিত্যিকদের লেখার সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলাম। কেন জানিনা আমার তখন একটা কথাই মনে হতো - হে বঙ্গ ভান্ডারে তব বিবিধ রতন ...
দেওয়ালে টাঙানো উদ্দালকের মায়ের অভিজাত মালা পরানো ছবিটির দিকে তাকিয়ে প্রসঙ্গ পরিবর্তন করে জিনিয়া। সে জানে, উদ্দালকের জীবনের সবথেকে বড় দুর্বলতার জায়গা তার মা। তিনি হঠাৎই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে চলে যান বছর পাঁচেক আগে।
এরপর গল্পে মেতে ওঠে তারা। একলা বাড়িতে একা পেয়ে চুমুতে চুমুতে তাকে ভরিয়ে দেয় উদ্দালক। তারপর বলে, পরশু আমার ফ্লাইট। এবার খুব বড় প্রজেক্ট। ফিরব প্রায় ছয় মাস পর। আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি। তখনই আমরা বিয়ের ব্যাপারে ডিসিশন নেব। তুই প্রস্তুত থাকবি জিনি।
এতদিনের মেলামেশার পরও বিয়ের কথায় জিনিয়ার মুখে লালচে আভা ফুটে ওঠে। সে বলে ওঠে, বিয়েই করতে হবে এরকম কোথায় লেখা আছে। আমার কত বন্ধুই তো লিভ টুগেদার করছে। পৃথিবীটা অনেক এগিয়ে গেছে সোনা, তুই কিন্তু এখনো সেই ব্যাকডেটেডই রয়ে গেলি।
উদ্দালক কতকটা আপন মনেই বলে ওঠে, পশ্চিমে না গিয়েই এখানে সবাই পশ্চিমী জীবনধারাকে নকল করছে। আর আমি বছরের বেশিরভাগ সময় পশ্চিমে থেকে দেখছি, ওরা ক্রমশই ফিরে যেতে চাইছে পরম্পরার দিকে, ঐতিহ্যের দিকে।
ওর মুখের দিকে চেয়ে আপন মনে বলে জিনিয়া, এই জন্যেই তোকে আমি এত ভালবাসি সোনা। তুই এরকমই থাক চিরদিন।
***
ছয় মাস পর।
কলকাতায় ফ্লাইট টেক অফ করার নির্ধারিত সময়ের পর দু ঘন্টা হয়ে গেল। কিন্তু এখনো উদ্দালক এর কোন মেসেজ এলো না কেন। বারবার হোয়াটসঅ্যাপ চেক করে জিনিয়া। আজ তার পরনে লাল পাড় জর্জেটের সাদা শাড়ি। সঙ্গে মানানসই টেরাকোটার গয়না। কপালে বেশ বড় একটা জ্বলজ্বলে টিপ। ও একা নয়, ওরা সবাই এই একই পোশাক পরে এসেছে। ছেলেরা সবাই আজ সাদা পাঞ্জাবি পাজামা। ওরা যাদবপুর ইউনিভার্সিটির প্রাক্তনী। ওরা সবাই গীতবিতান নামে একটি সংগঠনের সদস্য। ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হওয়ার পরই ওর অসাধারণ গানের গলার সুনাম ছড়িয়ে পড়ে ক্যাম্পাসে। কলেজের ফেস্টে গান গেয়ে সাড়া জাগায় জিনিয়া। তারপরই বন্ধুরা ওকে গীতবিতানের সদস্য করে নেয়। গীতবিতান আসলে যাদবপুর ইউনিভার্সিটির গান-বাজনা ভালবাসা পাগল ছেলে মেয়ের দল। রবীন্দ্রজয়ন্তী থেকে একুশে ফেব্রুয়ারী সবকিছুই পালন করে ওরা। তবে উদযাপনের মূল বিষয় গান। আজ ওরা সবাই এসেছে কার্জন পার্কে। আজ একুশে ফেব্রুয়ারি। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। অন্যান্য নানা সংগঠনের সঙ্গে গীতবিতানও আজ এই দিবস পালন করতে উদ্যোগী হয়েছে।
এবার মঞ্চে আসছে জিনিয়া - সেক্রেটারি তাপসের সুমিষ্ট বাচনভঙ্গিতে ওর নাম ঘোষণা হতেই হাততালির ঝড় বয়ে যায় ছাত্র-ছাত্রী মহলে। একটু লজ্জায় পড়ে যায় জিনিয়া। এত অনুষ্ঠান করার পরও মাইক হাতে নিলেই ওর গলা সামান্য কেঁপে যায়। সে মৃদু স্বরে বলে - আমার বাংলা ভাষার প্রতি এই অনুরাগের নেপথ্যে যে বন্ধু, আজ এতক্ষণে তার এই মঞ্চে চলে আসার কথা। কোন কারনে তার পৌঁছাতে দেরি হচ্ছে। তাই আর অপেক্ষা না করে অমর একুশের ভাষা শহীদদের প্রতি প্রণাম জানিয়ে আমি একটিমাত্র গান আজ শোনাবো এখানে।
প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের "আমি বাংলাকে ভালবাসি" গানটি তার সুমধুর কন্ঠে সবার মধ্যে সুরের আবেশ এনে দেয়। গান শেষ হবার পরই আবার হাততালির ঝড় বয়ে যায়। কানে অস্পষ্টভাবে ভাসতে থাকে সঞ্চালক তাপসের গলায় তার গানের প্রশংসা। তারপরই আসে সেই ফোন ...
এর পরের দিনগুলো কোথা দিয়ে কিভাবে কেটে গিয়েছিল আজ আর মনে করতে পারে না জিনিয়া। ভয়ংকর বিমান দুর্ঘটনায় উদ্দালকের মৃত্যু তার জীবনের সবকিছু স্তব্ধ করে দিয়েছিল। গান ছেড়ে দিয়েছে সে। বিয়েও করে নি কাউকে। শান্তিনিকেতনের একটি আশ্রমে অনাথ বাচ্চাদের আবাসিক স্কুলে স্বেচ্ছায় শিক্ষকতার দায়িত্ব নিয়েছে সে। সারা বছরে মাত্র একদিন ছুটি নিয়ে কলকাতায় আসে জিনিয়া। সেদিনটা একুশে ফেব্রুয়ারি। আজও কার্জন পার্কের মঞ্চে ভেসে আসে তার গলায় একটি গান ... আমি বাংলাকে ভালোবাসি।

Comments
Post a Comment