শিক্ষক দিবস

শিক্ষক দিবস এবং কয়েকটি কথা
দেবব্রত ঘোষ মলয়

আমি শিক্ষক হইনি। যদিও সে সম্ভাবনা ছিল ছোট থেকেই। তখন নবম শ্রেণী। বাড়িতে অভাব। সে সময় অনেক বাড়িতেই এরকম হতো। তখন স্কুলে নামমাত্র মাইনে ছিল সেটাও তিনমাস বাকি পড়ে গেল। বাবার অফিস বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, হেডস্যার ডেকে বললেন - মন দিয়ে পড়াশোনা কর, এখন থেকে হাফ ফ্রিতে পড়াশোনা করবি। অর্থাৎ ওই সামান্য বেতনেরও অর্ধেক মাস্টারমশায় মুকুব করে দিলেন। মন দিয়ে পড়াশোনা করতাম, তবে পাঠ্যপুস্তক ততটা নয়, যতটা নানা ধরনের সাহিত্যের বই। সে প্রসঙ্গ অন্য সময়।
সে সময়ে আমার বন্ধুরাও কেউ কেউ টিউশনি করে। একজন বলল - "তুই একটা টিউশনি করবি।"
আমি তো এক পায়ে খাড়া। তখনো পর্যন্ত নিজের রোজগার বলতে একমাত্র স্কুলে এনসিসি করে অল্প কটা টাকা হাতে এসেছিল। সেটা সম্ভবত ওই এনসিসির পোশাকের মেইনটেনেন্স এর জন্য। সে কি আনন্দ আমার আর আমার পিঠ পিঠি ভাইয়ের। স্কুলের ঠিক উল্টো দিকেই তখন পাড়ার একমাত্র মিঠাই এর দোকান। দুজনে মিলে কাঁচের শোকেস থেকে বেছে বেছে পাঁচটা ছয়টা করে মিষ্টি খেয়েছিলাম নানা রকম। এখনকার ছোটরা না চাইতেই কি সহজে সবকিছু পেয়ে যায়, তারা কল্পনাও করতে পারবে না আমাদের সেই পাওয়ার আনন্দ। যাইহোক মূল কথায় ফিরে আসি।
পরের দিন থেকেই শুরু হল সেই টিউশনি। যে পাড়ায় টিউশনি সে পাড়া উদ্বাস্তু কলোনি। বেশিরভাগ ঘরই দরমার। মানুষগুলোর ভাষা একটু অন্যরকম কিন্তু ভীষণ আন্তরিক ব্যবহার তাদের। কিন্তু খুব কড়া। আমাকে ছাত্রের মা, বাবা, ঠাকুমারা এটা সেটা খাবার দিতেন। কিন্তু এটাও শুনাতেন, এর আগে দুজন ম্যাষ্টর একে ঠিক করতে পারে নি। তোমাকে অনেক কষ্ট করে পয়সা দেবো - একে কিন্তু পাশ করাতে হবে। মাত্র চার দিনের মাথায় কোন পয়সা না নিয়ে সেই টিউশনি ছেড়ে দিই আমি। আমার জীবনে আমি এত নিরেট ছাত্র আর কখনো দেখিনি। ওই বাচ্চাটিকে পাস করাতে গেলে আমার নিজের ফেল করার সমুহ সম্ভাবনা ছিল।
এর পরের মাসে আমার প্রিয় বন্ধু অনির্বাণ আমাকে আরেকটি টিউশনির সন্ধান দিল। এদের বাড়ি স্টেশনের ওপারে। আমাকে বলা হয়েছিল রোববার যেতে। রোববার দিন ওই পাড়ায় গিয়ে খুঁজে পেতে বার করলাম বাড়িটি। একতলা বাড়ি, তিনটে ঘর একটা ছোট বারান্দা। বাড়ির লাগোয়া এক চিলতে জমিতে পেয়ারা গাছ, সুপুরি গাছ, নারকেল গাছ এবং কিছু ফুলের গাছ। আমি বাইরের দরজায় দাঁড়াতেই এক সৌম্যকান্তি ভদ্রলোক বেরিয়ে এলেন। আমাকে নিয়ে গিয়ে বসালেন ওদের বারান্দায় বেতের চেয়ারে। মাঝখানে একটি বেতের সেন্টার টেবিল এবং উল্টোদিকে আরো দুই তিনটি বেতের চেয়ার। কথা শুরু হওয়ার আগেই ঘরের পর্দা ঠেলে এগিয়ে এলেন এক ভদ্রমহিলা, তাঁর হাতে একটি প্লেটে কয়েকটি মিষ্টি এবং আরো দুই একটি খাবার দাবার। আমি ভীষণ লজ্জায় পড়ে গিয়ে আরে এসব কেন বলতেই ভদ্রলোক হেসে বললেন - তুমি একটা এতটুকু ছেলে এসব লৌকিকতা করবে না। হয়তো প্রয়োজনের তাগিদে ছাত্র অবস্থায় পড়াতে শুরু করেছ, তুমি তো আমাদেরও ছেলেরই মত।
আমার চোখে জল এসে গেছিল। মানুষ এত ভালো হয়। জলখাবার শেষ করার পরেই ভদ্রমহিলা শুধালেন - তুমি একটু চা খাবে বাবা?
আমি লাজুক হেসে বলি আমি চা খাই না মাসিমা।
তখনকার দিনে আমরা অপরিচিত সবাইকেই মাসিমা এবং মেসোমশাই বলতে স্বচ্ছন্দ্যবোধ করতাম।
ভদ্রলোক অর্থাৎ মেসোমশাই বললেন - দেখো বাবা আমাদের একটি ছেলে একটি মেয়ে। ছেলেটির নাম সুমন্ত এবং মেয়েটির নাম সোনালী। আমরা ওদের সোনা আর সুমন বলে ডাকি। পড়াশোনায় কেউই খুব খারাপ নয়। কিন্তু আমরা দুজনেই চাকরি করি, তোমার মাসিমা একটি গার্লস স্কুলে শিক্ষকতা করেন আর আমি শিক্ষকতা না করলেও শিক্ষা দপ্তরে চাকরি করি। তুমি শুধু রোজ নিয়ম করে ঘন্টা দুয়েক ওদের পড়াশোনাটা একটু দেখিয়ে দেবে। আমরা নিজেরাও অনেকটাই দেখাই, কিন্তু তুমি এখন পড়াশোনার সঙ্গে আছো, তোমার থেকে ওরা কোন অসুবিধা হলে জানতে পারবে।
আমি জিজ্ঞাসা করি ওরা কোন ক্লাসে পড়ে?
তখনই মাসিমা ছেলেমেয়ে দুটিকে আসতে বলেন এই ঘরে। সোনালী একটি ফ্রক পড়েছিল, মাথায় দুটো বিনুনি বাঁধা, মুখশ্রী বেশ মিষ্টি কিন্তু বুদ্ধিমত্তার ছাপ তাতে। ও নিজের নাম বলল এবং হেসে বলল ক্লাস এইটে পড়ে। সুমন একটি হাফপ্যান্ট গেঞ্জি পড়ে আছে, এক মাথা ঝাঁকড়া চুল, বড় বড় চোখ আর চোখে মুখে দুষ্টুমির ছাপ স্পষ্ট।। আমাকে প্রণাম করেই সুমনের প্রথম প্রশ্ন - আমি ক্লাস ফোরে পড়ি।  মাস্টারমশাই পড়া শেষ হয়ে গেলে চোর পুলিশ খেলবেন তো?
মেসোমশাই ওদের আবার ঘরে পাঠিয়ে দিয়ে আমাকে বললেন - তোমার নামটা কি?
আমি উত্তর দিই - মলয়।
উনি বললেন দেখো মলয়, আমাদের দপ্তরে প্রতি তিন মাসে মাইনে হয়। আমিও তোমাকে প্রতি তিন মাস ছাড়াই মাইনে দেব, তুমি ছাত্র একসাথে টাকাটা পেলে তোমার সুবিধা হবে।
যুক্ত হয়ে গেলাম সেই টিউশনিতে। ওনারা তখনকার বাজারে বেশ ভালোই মাইনে দিতেন।  ঠিক দু'বছর পড়িয়েছিলাম আমি সোনা আর সুমনকে। মা বাবার মতই ভীষণ ভালো ব্যবহার ছেলে মেয়ে দুটির। কোন পড়া ওদের বোঝাতে আমার কোন কষ্টই হয়নি। একদিন সোনালীর ক্লাস এইটের একটা অংক কোন ভাবে আমি সমাধান করতে পারিনি, ওকে বলেছিলাম আমি কাল বাড়ি থেকে অংকটা করে নিয়ে তোমায় দেব। পরের দিন অংকটা নিয়ে গিয়ে যখন সমাধান করি এবং ওকে শিখিয়ে দিই, ওর বাবা এসে বলেছিলেন আমার মানুষ চিনতে ভুল হয় না মাস্টারমশাই। এই যে আপনি ছাত্রীর কাছে স্বীকার করলেন যে অংকটা সমাধান হয়নি এবং বাড়ি থেকে করে আনলেন, এতে আমি খুব খুশি।
দু'বছর পরেই টিউশনি ছেড়ে দিয়েছিলাম আমি। কারণ তখন আমি একটা চাকরির ট্রেনিং এর সুযোগ পাই। আস্তে আস্তে মন থেকে আবছা হয়ে আসতে থাকে সোনালী সুমনরা। বছর দুয়েক পরে একদিন রাস্তায় দেখা। সোনালী আর ওর মা। আমাকে দেখেই রাস্তার মাঝখানে পায়ে হাত দিয়ে নমস্কার করে বলল মাস্টার মশাই ভালো আছেন? আমি হেসে বলি হ্যাঁ, তোমরা কেমন আছো? ওর মা বলেন আমরা ভালোই আছি মাস্টারমশাই তবে আমরা অন্য জায়গায় চলে যাচ্ছি। আপনি ওদের ছোটবেলার মাস্টার মশাই আশীর্বাদ করুন যেন ওরা জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয়। 
ওদের সঙ্গে আর দেখা হয়নি আমার। কিন্তু আমি নিশ্চিত এই দুটি ছেলে মেয়ে জীবনে যথেষ্ট প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আমি হয়তো শেষ অবধি শিক্ষক হয়ে উঠিনি, কিন্তু আমার গুটিকয় ছাত্রছাত্রীর কথা আজও মনে আছে।
না সে সময় শিক্ষক দিবস বলে কিছু ছিল কিনা জানিনা, কিন্তু এটা জানি শিক্ষার সঙ্গে জড়িয়ে ছিল সততা। আজ সম্পাদনা করতে এসে বহু সাহিত্য সভায়, গ্রামে গঞ্জে অনেক অল্প বয়সী ছেলে-মেয়ে এসে আলাপ করে তাদের কবিতা বা গল্প জমা দেয়। এরা অনেকেই কথা বলার সময় আমাকে স্যার বলে। এই ছেলেমেয়েরাও আমার স্নেহের ছাত্র ছাত্রীর মতো। এদের লেখা প্রকাশ করতে পারলে, এদের বই প্রকাশ করতে পারলে সব থেকে খুশি হই আমি। আমি বিশ্বাস করি আজও শিক্ষকতা শব্দটি তার গুরুত্ব হারিয়ে ফেলেনি, কিছু অনভিপ্রেত ঘটনা ঘটেছে মাত্র। শুধুমাত্র পুঁথিগত শিক্ষায় শিক্ষিত করেন যাঁরা তাঁদের বাইরেও অসংখ্য শিক্ষক ছড়িয়ে আছেন আমাদের চারপাশে। তাঁদের যেন চিনে নিতে পারি আমরা আর প্রদান করতে পারি যোগ্য সম্মান।
@দেবব্রত ঘোষ মলয়
৬/৯/২০২২

Comments