নদী, গ্রাম প্রকৃতি, মন্দির এবং দূর্গা ঠাকুর আনয়ন

 


নদী, গ্রাম প্রকৃতি, মন্দির এবং দূর্গা ঠাকুর আনয়ন 

দেবব্রত ঘোষ মলয়


আজ মহালয়া।
একদম ভোরে ঘুম ভাঙলো মহিষাসুরমর্দিনীর সেই চিরাচরিত মিঠে সুরে। আমাদের বাগানের শিউলি তলায় এখনো সেভাবে শিউলি হয়নি, কিন্তু সেই ভোরেই আমার নাকে কোথা থেকে শিউলির গন্ধ ভেসে এলো।
আজ পত্রিকা এবং প্রকাশনের কাজ বন্ধ রেখেছিলাম। বাড়ির পাশেই আমাদের সোসাইটির পুজো "বন্ধুরা"। পুজোকমিটির প্রথম বছরের প্রথম সভায় সবার সমর্থনে এ নাম আমারই দেওয়া, কারণ আমরা বেশ কিছু বন্ধু একত্রিত হয়ে এই পুজোর সূচনা করি। এ বছর আমাদের প্রতিমা শিল্পী দিব্যেন্দুর স্টুডিও থেকে। ওর স্টুডিও আমতার এক নিরিবিলি গ্রাম সোমেশ্বর সোমনাথ-এ। তরুণ শিল্পী দিব্যেন্দুর বাড়িতে (ওর স্টুডিও গ্যালারি অসেচনক) বেশ কয়েকটি পুজো কমিটির ভিড়, বাড়ির সামনের মাঠটি গাড়িতে গাড়িতে ছয়লাপ। পুরুষ মহিলা মিলিয়ে আমাদের প্রায় ৫০ জন সদস্য উপস্থিত হয়েছিল ঠাকুর আনতে। আমি আমার দাদা এবং আমাদের কমিটির এক সদস্য সিদ্ধার্থ আমার বন্ধু স্বপনের গাড়িতে গিয়েছিলাম।


অন্য কমিটিগুলি যখন গ্রামের কাঁচা রাস্তা দিয়ে এক এক করে তাদের প্রতিমাগুলি নিয়ে যাচ্ছে সে সময় আমাদের অপেক্ষা করতে হয়েছে বেশ কিছু সময়।ইতিমধ্যেই খিদে পেয়ে গিয়েছিল সবার। কমিটির পক্ষ থেকে আনা লুচি আলুর দম এবং মিষ্টি দিয়ে জলযোগ সারা হল। এ সময় আমরা দিব্যেন্দুর বাড়ির সামনেই সোমেশ্বর মন্দিরটি দেখলাম। সোমেশ্বর সোমনাথ গ্রামের নাম এই মন্দিরের কারণেই। সোমেশ্বর সোমনাথ শিব মন্দির একটি অতি প্রাচীন মন্দির। শিব ভক্ত মহারাজ শশাঙ্ক তাঁর রাজস্ব ভুরস্যুট পরগণায় ৬২০ থেকে ৬২৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে এই মন্দির স্থাপন করেন।  (সূত্র - সুরেন্দ্রনাথ কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ গবেষক ডক্টর শিশুতোষ সামন্ত)। মন্দিরটির গায়ে একটি ফলকে এ তথ্য খোদাই করা আছে। মূলত শিব মন্দির এটি। এই সন্ধ্যার সময় এখানে আরতি হচ্ছিল। জানতে পারলাম এই আরতি একেক দিন গ্রামের এক একজনের পালা পড়ে। আজকের ছোট্ট গ্রাম ভ্রমণে এটি আমাদের অন্যতম পাওয়া।

আরতি দেখে স্বপন আর আমি দুপাশে ঝোপ জঙ্গলে সবুজ গাছপালা ঘেরা রাস্তার মধ্য দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে লক্ষ্য করলাম এখানকার স্ট্রীট লাইটগুলো সোলার (সৌর শক্তি চালিত)। সূর্যের কিরণ থেকে বিদ্যুৎ তৈরি করে এই আলোগুলি গ্রামের রাস্তাকে সন্ধ্যার পর অন্ধকার মুক্ত রাখে।


এরপরই চোখে পড়ে সামনেই দামোদর নদ। এখানে নদী প্রস্থ খুব বেশি না হলেও মৃদু স্রোত আছে সর্বক্ষণ। নদীর দু'ধারে সবুজ গাছপালা ঘেরা নিসর্গ এত সুন্দর মোহিত না হয়ে পারা যায় না। নদী আমার খুব প্রিয়। এই নদীতে ছোট ছোট ডিঙি নৌকাগুলি নদী পাড়ের ঝোপচারের মধ্যে বাঁধা আছে এবং অল্প অল্প ঢেউয়ে দোল খাচ্ছে। মন উদাস করা এই দৃশ্য অনেকদিন মনে থাকবে।



ঘুরতে ঘুরতে দেখলাম গ্রামের আরো দুই একটি প্রাচীন মন্দির। দেখলাম বাঁশের ব্যাখারি দিয়ে তৈরি মাচা যেখানে গ্রামীণ মানুষ অবসর সময়ে আড্ডা দেন। 



আরো দেখলাম ছোটবেলায় দেখা ছিটেবেড়ার ঘর। কঞ্চি এবং ব্যখারির কাঠামো তৈরি করে তার গায়ে কাদামাটি লেপে এই ঘর তৈরি করা হয়।। এখানে আমরা যে ঘরটি দেখলাম সেটিতে অবশ্য মানুষ থাকে বলে মনে হলো না।। এমনিতে এই জায়গার বেশিরভাগ বাড়ি পাকা এবং দোতলা। গ্রামের মানুষের সঙ্গে আলাপচারিতায় জানলাম বেশিরভাগ বাড়িতেই পুরুষরা কর্মক্ষেত্রে বাইরে থাকেন এবং মহিলারা ঘর-সংসার সামলান এবং বাড়ির লাগোয়া ছোট্ট বাগানে ফসল ফলান ঘরে খাবার আনাজপত্রের জন্য।


এখানে একটা জায়গায় দেখলাম বেশ কিছু শুকনো ডালপালা সুন্দর করে গুছিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে।। দেখেই বোঝা যাচ্ছে এগুলি জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কল্পনার চোখে দেখে ফেললাম নিজের খেতের খাঁটি সবুজ সবজি কাঠের জ্বালানিতে রান্না করে খাওয়ার সেই দৃশ্য।


সাহিত্য চর্চার অবকাশে আজকের এই ভ্রমণ শুধুমাত্র প্রতিমা আনয়নই নয় গ্রাম এবং নদীর সান্নিধ্যে আমাদের এক অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা হয়ে রইল।


Comments