আনন দাস
(ছবি - ইন্টারনেট)
দেবব্রত ঘোষ মলয়
প্রতিদিনের অভ্যাস মত বিকেল আর সন্ধ্যের মাঝামাঝি সময়টা ছাদে পায়চারি করছিলাম। ছাদ আমার কাছে এক বিস্ময়কর জায়গা, যেখানে যুগপৎ বাড়িতেও থাকা যায় আবার বাড়ির বাইরেও থাকা যায়। ছাদের পশ্চিম দিকে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম ছোট্ট পুকুরের উপর সবুজ পানার উপর কি নিশ্চিন্ত মনে একটা মাছরাঙ্গা পাখি ওত পেতে আছে মাছের প্রতীক্ষায়। পুকুরটার ঠিক ওপারেই একটা ঘন বাঁশঝাড়। এত দূর থেকেও দেখা যাচ্ছে একটা বড় মাকড়সার জাল তাতে ধরা পড়েছে একটা পোকা। পুকুরটার ঠিক উপর দিয়ে ঝটপট করে এক ঝাঁক পায়রা উড়ে এসে আমাদের ছাদে জলের ট্যাংক এর উপর বসে বকবকম করতে লাগলো। বেশ কয়েকটা ঘুড়ি এসে পড়েছে ছাদে যার সুতোটা ওই পুকুরের উপর দিয়ে বাঁশগাছ অবধি বিস্তৃত। এখন এই সুতোগুলো আর সুতো নয় সিনথেটিক, তার উপর কড়া মাঞ্জা, লোকমুখে চিনা মাঞ্জা। ফলে অনেক পশু পাখি এই সুতো তাদের গায়ে লেগে আহত হচ্ছে। এই সময়টা আমাদের পশ্চিম দিকের বাগানের গাছে অনেক পাখ পাখালির সমাবেশ হয়েছে। তাই আমি এই ধেরে বয়সেও ওই মাঞ্জা দেওয়া সিনথেটিক সুতোটাকে একটা ছোট কাঠের টুকরাতে গুটোতে শুরু করলাম এবং গুটাতে গুটাতে একসময় শেষ হয়ে গেল সুতোটা। এবার একটু নিশ্চিন্ত হলাম অন্তত এই সুতো থেকে কোন পাখি বা প্রাণীর ক্ষতি হবে না।
ঠিক এ সময় বাড়ির পূর্ব দিকে ছোটবেলা থেকে শোনা সেই পরিচিত ডাক পেলাম ,"স্লো জুতি"। আমার ছোটবেলাতে বয়স্ক যে চর্মকারকে দেখতাম এই ডাক দিয়ে বাড়ির পাশ দিয়ে যেত যেখানে আমাদের বাবা কাকারা বাড়ির পুরনো ছেঁড়া জুতোগুলো সারিয়ে নিতেন এবং পালিশ করিয়ে নিতেন। আমি পূর্ব দিকের পাঁচিলে গিয়ে একটু ঝুঁকে দেখলাম এখন যে যাচ্ছে সেও কিন্তু অবিকল ছোটবেলার দেখা সেই মানুষটির মতোই।দেহাতি চেহারা, হাঁটু অব্দি আধ ময়লা ধুতি পরা গায়ে একটা ময়লা জামা, তার কাঁধে চামড়ার একটা ছোট্ট ঝোলা যার থেকে উঁকি মারছে কিছু জুতোর শুকতলা, সোল, হাওয়াই চটির ফিতে এবং লোহার তিন ঠেঙে একটা যন্ত্র। যার উপর রেখে জুতোতে পেরেক ঠোকা থেকে জুতা পালিশ সবই করা যায়।
আমার হঠাৎ মনে পড়ে গেল সাম্প্রতিক দীঘা বেড়াতে গিয়ে একটা হাওয়াই চটির ফিতে ছিঁড়ে গেছে। আমি ছাদ থেকেই হাত দিয়ে ডাকি - ও স্লো জুতি, একবার এদিকে এসো। ভাঙাচোরা মুখে দেহাতি মানুষটি ঘুরে দেখে আমাকে, তারপর তার কঠিন অথচ সারল্য মাখা মুখে আমাকে হাতের ইঙ্গিত করে বাড়ির সামনে সে অপেক্ষা করছে।
সিড়ি বেয়ে নিচে নেমে আসি। সিঁড়ির তলায় সদর দরজার মুখেই জুতো চটি এইসব থাকে। সেখান থেকে দীঘা ফেরত হাওয়াই চটি নিয়ে দরজা খুলে বাইরে গিয়ে তাকে দিই। চটিটা ভালো করে উল্টে পাল্টে দেখে বলল- হ্যাঁ করে দেব। জিজ্ঞাসা করলাম কত লাগবে? সে বলল ৩০ টাকা।
দেখলাম প্রথমে একটা লোহার সূচালো মুখ যন্ত্র দিয়ে ফিতেগুলো খুলে ফেললো ঝটপট। তারপর ঠিক ওই রংয়েরই নতুন দুটো ফিতে নিয়ে আবার ওই যন্ত্রটা দিয়ে আস্তে আস্তে লাগিয়ে দিয়ে চটি প্রস্তুত করে দিল।
এ সময় অপর একজন মুচি ভাই ওই রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল। দুজনের মধ্যে দুই মিনিট কথা হল একটু হাসি। এত দারিদ্র্য কষ্টের মধ্যেও ওদের হাসিটা দেখে খুব নির্ভেজাল মনে হল। দেশোয়ালী ভাই তবুও কথাবার্তা বেশিক্ষণ বলল না কেউই তাতে কাজের ক্ষতি হবে।
এবার আমি প্রশ্ন করি, তোমার নাম কি ভাই?
ও উত্তর দেই, আমার নাম আনন দাস।
তা ভাই এই যে এত কষ্ট করে পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে বেড়াচ্ছ রোজকারপাতি হয় ভালো?
সে মৃদু হেসে বলে, হলে হয় ভালোই আবার কোন কোন দিন কিছুই হয় না।
জিজ্ঞাসা করি তবুও দৈনিক কত রোজকার হয় মোটামুটি? সে হেসে বলে এ শুনে কি করবেন বাবু। যদি অনেকগুলো কাজ পাই সেদিন একটু ভালই হয়। কিন্তু আমাদের মত গরিব মানুষদের কাছে সেটা ভালো, সবার কাছে তো নয়।
আবার প্রশ্ন করি তোমার দেশ কোথায়, ছাপরা? ছোট থেকে অনেক দেহাতি মানুষকেই দেখেছি তারা ছাপরা থেকে আসেন। ও কিন্তু বলল না আমার দেশ পাটনা।
আমি আবার বলি, বাবা সে তো রাজধানী শহর। ওখানে তো অনেক কাজ।
ও হেসে বলে পাটনায় অনেক গাঁও আছে। আমি সেরকমই একটা গ্রামে থাকি।
এখানেও তোমার বাড়ি আছে?
আমার বোকা বোকা প্রশ্ন শুনে অবাক হয়ে আনন হেসে বলে - এখানে কি বাড়ি করার মত টাকা আছে বাবু। আমরা চারজন একসাথে থাকি একটা বাড়িতে ভাড়া। একটা ঘরের ভাড়া চারভাগ হয়ে যায় তাই আমাদের কারোর অসুবিধা হয় না।
এ সময় দূর্বা (আমার গিন্নি) তার একটা স্ট্র্যাপ ছেঁড়া চটি নিয়ে এসে উপস্থিত হন। এবং বলে, কি গো এটা করে দিতে পারবে?
আনন্ এর কিছুতেই না নেই, বলল হ্যাঁ কুড়ি টাকা লাগবে।
কয়েক মিনিটের মধ্যে ওই জুতোটিও সারিয়ে দিয়ে উঠে পড়ল সে। আমি তাকে টাকা দেওয়ার পর জিজ্ঞেস করলাম, এই যে চারিদিকে এত ঘটনা দুর্ঘটনা, এই যে এত অভাব মানুষ চাকরি পাচ্ছে না, তোমার চিন্তা হয় না?
আনন আবার ওর ওই সরল হাসিটা হেসে উত্তর দেয় - ওসব চিন্তা ভাবনা তো পড়ালেখা করা বড়লোক মানুষদের জন্য বাবু। আমি সারাদিনে যতটা খাটতে পারবো ততটা রোজকার হবে, দুপুরের দিকে কোন বাড়ির দালানে কিংবা গাছের ছায়ায় ছাতু খেয়ে একটুখানি ঘুমিয়ে নেব। ব্যাস বিকেলে আবার হাঁটা শুরু এবার বাড়ির দিকে।
ধীরে ধীরে আনন মিলিয়ে গেল পাড়ার শেষ সীমানায়। আমার একটা কথাই মনে হলো শুধু, সাধারণভাবে হেসে খেলে বেঁচে থাকার জন্য যেগুলো প্রয়োজন এই পৃথিবী সেগুলো তো আমাদের দিয়েছে। কিন্তু আমরা আমাদের জীবনটাকে আরো জটিল করে ফেলেছি কারণ আমরা আরো সুখী জীবন ভোগ করতে চাই। আমরা ক্রমশেই এগোতে থাকবো, সত্যিই কি তাই?
@দেবব্রত ঘোষ মলয়
Comments
Post a Comment